বিশেষ প্রতিবেদন:
চট্টগ্রাম, ১৯৭১: একাত্তরের অবরুদ্ধ নভেম্বর। চট্টগ্রাম শহর তখন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী মিলিশিয়াদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সার্বক্ষণিক টহল এবং ধরপাকড়ে থমথমে। শহরের ভেতরে অবস্থান নিয়ে গেরিলা অপারেশন চালানো মানেই ছিল প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। কিন্তু সেই চরম ঝুঁকি উপেক্ষা করে বীর গেরিলা কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ আল হারুনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহর কাঁপিয়ে দেওয়া হয় দুটি ঐতিহাসিক ও দুঃসাহসিক অভিযানে। ১ নভেম্বরের আগ্রাবাদ ফায়ার ব্রিগেড অফিসে সফল অভিযানের পর পাকিস্তানি বাহিনী যখন সতর্ক অবস্থান নেয়, ঠিক তখনই শত্রুপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপর্যস্ত ও ব্যস্ত রাখতে কমান্ডার হারুনের দল পর পর দুটি নতুন আঘাত হানে।
প্রথম অভিযানটি ঘটে ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে, পূর্ব প্রান্তের চান্দগাঁও সরকারি ট্যাক্স অফিস ও ওয়্যারহাউজে। ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলে রাতের আঁধারে শত্রুর নজর এড়িয়ে বীর গেরিলারা হ্যান্ড গ্রেনেড ও প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভের শক্ত বিস্ফোরণ ঘটালে পুরো চান্দগাঁও এলাকা কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন ধরে যায় দখলদার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও রসদাগারে; পাকিস্তানি বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই গেরিলারা নিরাপদে সটকে পড়েন।
এর মাত্র পাঁচ দিন পর, ৮ নভেম্বর মধ্যরাতে বিএলএফ হাই কমান্ডের নির্দেশে দ্বিতীয় অভিযানটি পরিচালিত হয় কালুরঘাট ও ষোলশহরের মধ্যবর্তী রেললাইনে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সেনানিবাসে পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ বন্ধ করতে কমান্ডার হারুন ও ডা. মাহফুজুর রহমানের বিস্ফোরক দল টহলরত শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রেললাইনে শক্তিশালী বিস্ফোরক বসান। বিকট বিস্ফোরণে রেললাইন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেনানিবাসে রসদ পরিবহন থমকে যায়; শুধু তা-ই নয়, পরদিন পাকিস্তানি সেনারা লাইন মেরামত করতে এলে গেরিলারা দূর থেকে ‘কভারিং ফায়ার’ দিয়ে সেই কাজও বানচাল করেন এবং সফলভাবে নিরাপদে নিজ আশ্রয়ে ফিরে আসেন।
দৈনিক আজাদীতে বরেণ্য সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন চৌধুরীর ‘তিন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা’ শিরোনামের ঐতিহাসিক উপসম্পাদকীয়তে এই গৌরবময় মুক্তিসংগ্রামের পারিবারিক ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছিল—যার প্রথম প্রজন্মে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী আলেম নেতা মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, দ্বিতীয় প্রজন্মে বীর মুক্তিসংগ্রামের সংগঠক ও কমান্ডার শাহজাহান ইসলামাবাদী, এবং তৃতীয় প্রজন্মে প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া বীর গেরিলা কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ আল হারুন। তিন প্রজন্মের এই অতুলনীয় দেশপ্রেম, ত্যাগ ও সাহসিকতার ইতিহাস আমাদের জাতীয় জীবনে এক চিরভাস্বর অনুপ্রেরণা; বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ আল হারুন ও তাঁর সকল সহযোদ্ধার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও রক্তিম সালাম। গাজী ইসলামাবাদী আইডি থেকে সংগৃহিত।